ইফতারের দস্তরখানে ইবনে উমর (রা.)-এর রোমান্টিক সুন্নাহ!
কাতিব সাদিক

ইফতার মানেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে থরে থরে সাজানো খিচুড়ি, বিরিয়ানি, ছোলা বুট, পেঁয়াজু, বেগুনি, জিলাপি, আলুর চপ আর গ্লাস ভরতি ঠান্ডা শরবত। সারা দিনের ক্ষুধা আর তৃষ্ণার পর ভোজনরসিক বাঙালি যখন দস্তরখানে বসে, তখন তার সব মনোযোগ থাকে জিলাপির প্যাঁচ আর মুড়ি মাখানোতে ব্যস্ত।
কিন্তু ইসলামের ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ইফতারের ধরন সবার ক্ষেত্রে সবসময় কেবল খাদ্যকেন্দ্রিক ছিল না। বিখ্যাত সাহাবি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এর ইফতার করার পদ্ধতিটি শুনলে আজকের দিনের অনেক ভোজনরসিক হয়তো অবাক হবেন, আবার কেউ কেউ হয়তো মনে মনে একটু মুচকি হাসবেন!
এ ব্যাপারে মুহাম্মদ ইবনে সিরিন (রাহ.) থেকে বর্ণিত আছে,
عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ سِيرِينَ، قَالَ: «رُبَّمَا أَفْطَرَ ابْنُ عُمَرَ عَلَى الْجِمَاعِ قال الهيثمي: رَوَاهُ الطَّبَرَانِيُّ فِي الْكَبِيرِ، وَإِسْنَادُهُ حَسَنٌ. مجمع الزوائد ومنبع الفوائد ج 3 ص 156 ح 4890.
মুহাম্মদ ইবনে সিরিন (রাহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইবনে উমর (রা.) কখনো কখনো স্ত্রী সহবাসের মাধ্যমে ইফতার করতেন।
এর ব্যাখ্যায় আল-হায়সামি (রাহ.) বলেন, এটি ইমাম তাবারানি রাহ. তাঁর আল-মুজামুল কাবীর গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন এবং এর সনদ (বর্ণনাধারা) হাসান বা নির্ভরযোগ্য। (মাজমাউয যাওয়াইদ ওয়া মানবাউল ফাওয়াইদ, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ১৫৬, হাদিস নং: ৪৮৯০)
আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি (রাহ.) তাঁর উমদাতুল কারীতে বলেন, ‘এর দুটি ব্যাখ্যা হতে পারে—এক, এটি শারীরিক চাহিদার প্রবলতার কারণে ছিল, যদিও রোজা সাধারণত প্রবৃত্তি দমন করে।
এই বক্তব্যের সমর্থনে আবু নুআইম অন্য একটি সূত্রে বর্ণনা করেন যে, ইবনে উমর (রা.) স্বয়ং বলেছেন, ‘আমাকে এমন কিছু (শারীরিক শক্তি) দেওয়া হয়েছে, যা আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) ব্যতীত আর কাউকে দেওয়া হয়েছে বলে জানি না।’
কল্পনা করুন, একদিকে একদল মানুষ ইফতারের প্লেট নিয়ে যুদ্ধ করছে—কার প্লেটে কয়টা পেঁয়াজু পড়ল, সেই হিসাব মেলাতে ব্যস্ত। আর অন্যদিকে ইবনে উমর (রা.) রোজাকে বানিয়েছেন আত্মার তৃপ্তির বিষয়। তাঁর এই ব্যতিক্রমী কাজ দ্বারা বোঝা যায়, ইবাদত এবং সাংসারিক ভালোবাসা আলাদা নয়; বরং একটা অপরটার পরিপূরক হতে পারে।
অধিকন্তু ইফতারের সময়টি দোয়া কবুলের সময়, আর সেই মুহূর্তে হালাল উপায়ে নিজের সঙ্গীর সান্নিধ্য পাওয়াটাও যে সওয়াবের কাজ এবং এর মাধ্যমে ভালো সন্তানলাভের আশা করার বিষয়টিও পাওয়া যায়।
অনেকে হয়তো ভাবছেন, এ তো দেখি বেশ ভালো সুন্নাহ! তবে মনে রাখবেন, ইবনে উমর (রা.) ছিলেন প্রচণ্ড শারীরিক শক্তির অধিকারী এবং অত্যন্ত সংযমী একজন মানুষ। আমরা যারা এক প্লেট ছোলা-মুড়ি না খেলে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারি না, তাদের জন্য এই পথে হাঁটা একটু ঝুঁকিপূর্ণই বটে! হয়তো ইফতারের আগেই হাইপোগ্লাইসেমিয়ায় (রক্তে শর্করা কমে যাওয়া) অজ্ঞান হওয়ার দশা হবে, তাই সাবধান!
যদিও ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী সূর্যাস্তের পর রোজা ভঙ্গের (ইফতার) বৈধ যেকোনো মাধ্যম ব্যবহার করা যায়। তাছাড়া এই বর্ণনাটি থেকে বোঝা যায়, পানাহারের পাশাপাশি বৈধ স্ত্রী সহবাসের মাধ্যমেও রোজা সম্পন্ন করা জায়েয, যা বিখ্যাত সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এর আমল দ্বারা প্রমাণিত।
এই রেওয়ায়েত অনুযায়ী ইবনে উমর (রা.)-এর এটা নিয়মিত আমল ছিল না; বরং কখনো কখনো ইফতার করতেন নিজের স্ত্রীর সাথে মিলনের মাধ্যমে। অর্থাৎ, আজানের পর খেজুর বা পানির বদলে তিনি ভালোবাসাকেই প্রাধান্য দিতেন। সত্যিই ইবনে উমর (রা.)-এর এই আমলটি ছিল একটি বৈচিত্র্যময় এবং সাহসিকতাপূর্ণ আমল!
তাই কেউ যদি ইফতারের সময় খাবারের চেয়ে স্ত্রীর দিকে বেশি মনোযোগ দেয়, তবে তাকে রোমান্টিক ভাবার পাশাপাশি এই হাদিসটির কথাও মনে করিয়ে দিতে পারেন।
সবশেষে বলা যায়, পেঁয়াজু-বেগুনি তো রোজই খাওয়া হয়, কিন্তু ইবনে উমর (রা.)-এর এই অনন্য আমলটি যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ভালোবাসা কখনো কখনো ক্ষুধার চেয়েও বেশি শক্তিশালী!
ইসলামের ইতিহাসে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) ছিলেন সুন্নাহর অনুসরণে অত্যন্ত কঠোর এবং একনিষ্ঠ একজন ব্যক্তিত্ব। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কাজকেও তিনি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে নিয়েছিলেন। সেই কঠোর সাধক এবং মুত্তাকী সাহাবীর জীবনের একটি বিশেষ দিক—ইফতারের মুহূর্তে স্ত্রী-সহবাসের মাধ্যমে রোজা ভঙ্গ করা—প্রথম দর্শনে বিস্ময়কর মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর জীবনদর্শন ও নফসের ওপর নিয়ন্ত্রণের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।
তবে একজন মুমিনের উচিত, নিজের দ্বীন ও দুনিয়ার উপকারী কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকা এবং অনর্থক বা অপ্রয়োজনীয় বিষয় ত্যাগ করা। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের ইসলামের সৌন্দর্যের অন্যতম দিক হলো তার অনর্থক বিষয় ত্যাগ করা।’ (তিরমিজি: ২২৩৯)
আল্লাহই ভালো জানেন।



