‘তারানা’ : হৃদয় উঠোনে ঝরা প্রেমের বকুল
তারানা গজল নিয়ে সাবের চৌধুরীর আলাপ

যেন বিকেল, ঘনঘোর বৃষ্টির পরে রোদ উঠবে বলেও শেষে আর উঠেনি, সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, চারপাশে ছড়িয়েছে অদ্ভুত এক আলো। ঠাণ্ডা বাতাস বইছে একটু করে। গাছের পাতা আর টিনের চাল হতে জলের ফোঁটাগুলো ঝরছে টুপটাপ। ছোট্ট নদীটা বৃষ্টির নতুন পানিতে খরস্রোতা হয়ে আছে আরো। নদীর ওপারে হা হা প্রান্তর। যতদূর চোখ যায়, কেউ কোথাও নেই। ঘোলাটে আকাশজু্ড়ে মন খারাপ করা এক শূন্যতা শুধু। নিঃসঙ্গ ও জলভেজা নদীর পাড়টিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে একজন মানুষ, আর বিষণ্ন আস্ত বিকেলটা এসে ঢুকে পড়েছে তার বুকের ভেতর। চুপি চুপি এসেছে শৈশব, ধুলোবালি, ফেলে আসা জীবন, আর অব্যক্ত এক বেদনায় ফুঁপিয়ে উঠেছে সে, কী মনে করে কে জানে!
‘তারানা’র শুরুতে দেওয়া ১৫ সেকেণ্ডের ব্যাকগ্রাউন্ড সংটা শোনার পর এমন একটা ছবি আমার মনে এসেছে। আসলে মন যেভাবে দ্রবিভূত হয়েছে, শব্দ দিয়ে প্রকাশ করতে পেরেছি তার সামান্যই; আর না হয় এর অভিঘাত আরো গভীর!
এই ছবিটা কেন এলো?
সুরের মধ্যেই স্মৃতিকাতরতা ও বেদনার বিষয়টা ছিল, একে আরো গভীর করেছে আমার পূরনো অভিজ্ঞতা।
আমি মাঝে মাঝেই মিউজিক ছাড়া ব্যাকগ্রাউন্ড নাশীদগুলো শুনি। সেগুলোতে সুরের সাথে মিলিয়ে নির্জনতা ও নৈঃসঙ্গের বোধকে মনোরম বেদনায় রূপান্তরিত করার জন্য বিষণ্ন দৃশ্যগুলো ব্যবহার করা হয়। বোধ করি শুরুর এই সুরলহরীটি শুনে এই ছবিটি তৈরী হওয়ার পেছনে সেগুলোও কাজ করেছে নেপথ্যে।
এই সামান্য অংশটি শুরু হতেই হৃদয়ের ভিতর একটা বিশেষ প্রস্তুতির সূচনা টের পাওয়া যায়। শেষ হতে হতে বুকজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে প্রবল এক পিপাসা, পবিত্র এক কামনা, অধীর অপেক্ষা–এমন কোন সুরের জন্য, যা পিপাসাকে নিবারিত নয়, করে তুলবে ততোধিক বেসামাল। আত্মহারা হয়ে কোমল কিছুতে ডুবে যাবে ভেবে সমগ্র সত্তায় সৃষ্টি হয় অসম্ভব এক আলোড়ন। ঠিক এমন সময়টিতে আহমদ আবদুল্লাহ তাঁর মায়াবি কণ্ঠে গেয়ে উঠেন–ম্যায় নে সূনা উনকি হার আদা কি কাহানী। আমি শুনেছি তাঁর সমস্ত গল্প, উঠাবসা হাঁটা সকল চাহনি।
হৃদয়ের এই সম্পন্ন অবস্থায়, এমন পাগল পাগল হয়ে থাকার পর আমি যেন এটিই শুনতে চেয়েছিলাম। আত্মার গভীর কোথাও হতে চিৎকার উঠে–হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমাকে এই গল্পটিই শোনাও ঠিক। এর জন্যই তো আমি চোখে জল নিয়ে বসে আছি অনন্তকাল। আমিও শুনেছি তাঁর সব কিছু। ‘কূঈ নেহি উনকে জ্যায়সা, না কূঈ সানী।’ তাঁর মত কেউ নেই, নেই কোন সমতূল। ‘চোখ মেলে তাঁকে দেখিনি কখনো, ফির ভি ম্যায় তো দিল সে দিল দিওয়ানা বন গায়া।’ আমি জানি সে কে। আমি চিনি তাঁকে। চিনে এই বিকেল, নদী, নিঃসঙ্গ আকাশ, ফেলে আসা জীবন, ধুলোবালি, সমস্ত শৈশব; তবু এখন তাঁর নাম নিব আমি। অতৃপ্ত ঠোঁটদুটো পরস্পরকে চুমো খেয়ে মায়াবি মীমের মধ্য দিয়ে সুরভি ছড়িয়ে দিবে তার সে আতরগন্ধী নাম–‘মুহাম্মদ, মুহামদ, মুহাম্মদ মেরা’, আমার জীবনে অসম্ভব সুন্দর এক সংগীত হয়ে এসেছেন তিনি।’
‘যে আলোয় সুন্দর হয়ে উঠেছে আকাশ, মনোরমা হয়েছে পৃথিবীজমিন, এ হেরার সে জ্যোতিরই অমলীন ধারা, সেই যে শুরু হয়েছিল শান্তি ও হেদায়াতের এক ঐশী সফর, ধরণীকে তিনি এমনই কল্যাণে সবুজ করেছিলেন।’
আ-কা কি জবাঁ পে জু রব কা পয়াম আয়া, উন কি বাত বাতুঁ মে যমানা বন গায়া।’ এই কথার গভীরতা, শব্দ বাক্যের নিপুনতা, মর্মের ঐশ্বর্য্য, আহমদ আবদুল্লাহ পাগল করা সুরের মায়া ও আকুলতা, সবটুকু এখানে–অক্ষম এই শব্দের খোলসে ধারণ করা মুশকিল। সমগ্র ইতিহাস নিংড়ে নিলে বোধের যে ফোঁটাটি টপ করে খসে পড়ে হৃদয় জমিনের পরে, এ যেন সেই টের, সেই শব্দ গহীন।
আমার মুহাম্মদ তিনি। জু হোনে সে আপনা নসীব মিল গায়া, যাকে পেলে আমার ভাগ্য বদলে যায়, যাকে পাওয়া মানে ‘হাবীব মুহাম্মদ’কে পাওয়া। ‘ইরাদায়ে দিল মে বস ইতনা আগর।’ খুব তো চাইনি কিছু, এটুকুই সামান্য সাধ শুধু–জীবনভর তাঁর প্রশস্তি গাইব আমি।’

এই সংগীতটি কবে রিলিজ হয়েছে এখনো দেখিনি, আমি সন্ধান পেয়েছি এই সেদিন। এরপর থেকে অজস্র বার শুনেছি। শুনতে শুনতে নানা দৃশ্য চোখে ভাসে। মানুষের কল্পনা তো স্বাধীন। মনে হয় মসজিদে নববীর সামনে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসে আছেন। চারপাশে সাহাবাগণ গোল হয়ে ঘিরে রেখেছেন তাঁকে। আচানক তাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন আহমদ আবদুল্লাহ ও মাসুম, অনতি দূরে, চোখ নিচু করে চুপচাপ। নবীজি নরম চোখে একটু সময় তাকিয়ে থেকে তারপর জিজ্ঞেস করলেন–আসবে না কাছে? নবিজীর চোখে-মুখে ছড়িয়ে পড়া মায়াবি হাসির আভা দেখে আর আদুরে সম্বোধন শুনে দুজনেই আত্মহারা হলেন। দুজনের চোখ হতে গড়িয়ে পড়লো দু ফোঁটা অশ্রু। তারপর বেসামাল হয়ে গাইতে শুরু করলেন। বাতাসে ছড়ালো বেহুশ করা এক সুরলহরী–জিন্দেগী কা এক হাসিঁ তারানা বন গায়া’। আবু বকর সাথে সাথে চোখ নিচু করে ফেলেছেন। তাঁর হৃদয় ভরে উঠেছে সুশান্ত এক আলোর আভায়, উমর কপালে আদুরে ভাঁজ ফেলে তাকিয়ে দেখছেন, মুখে একটু করে স্মিতহাসি। উসমান চোরা চোখে একটু পর পর দেখছেন নবীজিকে। কী সুন্দর এই মানুষটা! আলী উঠে নরম পায়ে রওয়ানা করেছেন আরো কাছে থেকে শুনবেন বলে। একটু দূরে, পেছনে বসা আবু জর কাঁপছেন আনন্দে, আবেগে। আনাস, মুআজ ইবনে জাবাল…
এই সংগীতে আমি আমার যাচিত আহমদ আবদুল্লাহকে পেয়েছি এবং মাসুম বিল্লাহ নামক মায়াবি আরেকটি সুরকে নতুন করে আবিস্কার করেছি। শোনার পর ধরেই নিয়েছিলাম লিরিকটা পাকিতানের পুরনো কোন মনীষীর হবে, তবু কৌতুলহ বশত ডেস্ক্রিপশনে গিয়ে হতবাক হয়েছি। কল্পনাতেও ছিল না বাংলাভাষী কেউ উর্দু জবানে এমন মায়াবি একটি সংগীত রচনা করতে পারে। এ যে আহমদ আবদুল্লাহ স্বয়ং, সুরটাও তিনিই বানিয়েছেন।
আহমদ আবদুল্লাহর সাথে কখনো কথা হয়নি, দূর থেকে দেখেছি শুধু একবার; কিন্তু আমার একটা অদ্ভুত মনোভঙ্গি আছে–দূর থেকে কারো লেখা, কথা
বা সংগীত শুনে তাঁর প্রতি একটি সুন্দর অনুমান সৃষ্টি হয়। সেখান হতে আমি আহমদ আবদুল্লাহকে অনুভব করি–শান্ত, সরল, মিষ্টি, বন্ধুবৎসল একজন মানুষ। যে কথা বলতে গিয়ে হাসে, হাসতে হাসতে নিঃশব্দ হয়। যে সরল কিন্তু বোকা নয়। স্মার্ট, বোধসম্পন্ন এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল। কখনো সাক্ষাত হলে এই সংগীতটির জন্য আমি তার হাতে চুমু খাব।
আহমদ আবদুল্লাহ, ভালোবাসি ভাই!
https://www.youtube.com/watch?v=hIVTVDqzR4I



