১৫ মাসে বেফাকের ৪ সিনিয়র সহ-সভাপতির ইন্তেকাল, একজনের পদত্যাগ

জামিল আহমদ ||

বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ-বেফাক। বাংলাদেশের কওমি মাদরাসা ভিত্তিক শিক্ষার্বোডগুলোর মধ্যে সর্ববৃৎ। বেফাকের দায়িত্বশীল ছিলেন আমাদের আকাবীররা। গত একবছরে বাংলাদেশের জন্য ছিলো শোকের বছর। বিশেষ করে বৈশ্বিক মহামারী মরণঘাতী নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের মৃত্যুবরণ করেছেন ৮ হাজার ৯৯৪ জন। এখন পর্যন্ত মোট করোনা রোগীর সংখ্যা ৬ লাখ ৫ হাজার ৯৩৭ জনে। বিশেষ করে আমরা হারিয়েছি এই এক বছরে প্রায় শতাধিক আলেমেদ্বীন। যারা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্বোড, রাজনৈতিক দল, অরাজনৈতিক সংগঠনের দায়িত্বশীল ছিলেন।

১ বছর ৩ মাসে সময়ের মধ্যে বেফাকের ৪ জন সিনিয়র সহ সভাপতি ইন্তেকাল করেছেন, একজন পদত্যাগ করেছেন। এখানে কারোই ইন্তেকাল অল্প বয়সে বা দূর্ঘটনায় হয়নি। সবাই বার্ধক্যজনিত কারণে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ছিলেন। এগুলোই ইন্তেকালের কারণ নয়। মূল কারণ হায়াত শেষ, তাই আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে তাঁর মেহমান করেছেন। আল্লাহ তায়ালা যেন তাদেরকে জান্নাতের উচু মাকাম দান করেন।

আমরা দায়িত্বশীল নির্বাচনের ক্ষেত্রে বারবারই বয়সের দিক খুব বেশি বিবেচনা করি। কিন্তু কেন? যাদের বার্ধক্য এলে দায়িত্ব দিই তারা কি বার্ধক্যের আগে দায়িত্ব পাওয়ার উপযুক্ত ছিলেন না? আমি বেফাক- হাইয়ার প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানাই। এবার সিনিয়র সহ-সভাপতি দায়িত্বশীল কিছুদিনের জন্য স্থগিত রাখা হউক। বা এমন কাউকে না আনা হউক, যাদের অবস্থা বিগতদের মতো।

মাওলানা আশরাফ আলী রহ. (ইন্তেকাল ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯) : গত ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর সোমবার দিনগত রাত পৌনে ২টার দিকে রাজধানীর আসগর আলী হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ-বেফাকে সিনিয়র সহ-সভাপতি, জামিয়া শারঈয়্যাহ মালিবাগের প্রিন্সিপাল ও শায়খুল হাদিস এবং কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ সংস্থা আল হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশের কো-চেয়ারম্যান মাওলানা আশরাফ আলী।

মাওলানা আযহার আলী আনোয়ার শাহ রহ. (ইন্তেকাল ২৯ জানুয়ারি ২০২০) : ২০২০ সালের ২৯ জানুয়ারি বুধবার বিকাল ৫টার কিছু পর ধানমণ্ডির ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ-বেফাকের সিনিয়র সহসভাপতি আল্লামা আযহার আলী আনোয়ার শাহ। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়েসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন, গুণগ্রাহী ও শুভার্থী রেখে গেছেন।

মাওলানা আবদুল কুদ্দুস (পদত্যাগ- ৩ অক্টোবর ২০২০) : ২০২০ সালে ৩ অক্টোবর শনিবার বেফাকের গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদ ভারপ্রাপ্ত সিনিয়র সহ-সভাপতি ও মহাসচিব পদ থেকে সদ্য পদত্যাগ করেন জামিয়া ইমদাদুল উলুম ফরিদাবাদের মুহতামিম মাওলানা আবদুল কুদ্দুস। এর আগে (২২ সেপ্টেম্বর) মঙ্গলবার বেফাকের কেন্দ্রীয় অফিসে খাস কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মহাসচিব মাওলানা আবদুল কুদ্দুস জানান তিনি পদত্যাগ করবেন। এদিন উপস্থিত সদস্যদের কেউ কেউ সেখানেই তাকে পদত্যাগ করতে বললে তিনি জানান আগামী ৩ অক্টোবর বেফাকের আমেলা বৈঠকে তিনি পদত্যাগ করবেন। খাস কমিটির বৈঠকে তার দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত নিয়েও কথা হয়। তবে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। মাওলানা আবদুল কুদ্দুস তার ঘনিষ্ঠজনদের কাছে বলেন, আমার শাইখ ও মুর্শিদ (আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.) নেই, আমি আর কোনো পদে থাকবো না, আমাকে কেউ আর কোথাও রাখতে পারবে না। তবে তিনি পদ ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিলেও কেউ তাকে পদে বহাল থাকার অনুরোধ করেননি। মাওলানা আবদুল কুদ্দুস বেফাকের মরহুম সভাপতি আল্লামা শাহ আহমদ শফীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। কয়েক মাস আগে ফাঁস হওয়া বেফাকের বহিষ্কৃত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাওলানা আবু ইউসুফের সঙ্গে তার ফোনালাপে কিছু অনিয়মের বিষয় প্রকাশ পায়। তখন থেকেই তার পদত্যাগের দাবি জোরালো হতে থাকে। তবে হাটহাজারী হুজুরকে দিয়ে তিনি নিজের নামে ‘সাফাইপত্র’ আনান। পরবর্তী সময়ে হাটহাজারীতে বেফাকের খাস কমিটির বৈঠকে বিভিন্ন অনিয়ম তদন্তে একটি কমিটিও হয়। যদিও সেই কমিটির রিপোর্ট এখনও আলোর মুখ দেখেনি।

মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী রহ. (ইন্তেকাল : ১৩ ডিসেম্বর, ২০২০) : ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর রববার দুপুর ১টায় রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। এর আগে গত ১ ডিসেম্বর শ্বাসকষ্টজনিত অসুস্থতার কারণে মাওলানা কাসেমীকে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মাওলানা কাসেমীর ঠান্ডা ও শ্বাসকষ্ট থাকলেও কয়েক দফা করোনা পরীক্ষায় নেগেটিভ ফলাফল আসে।

মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস রহ. (ইন্তেকাল : ৩১ মার্চ ২০২১) : বুধবার (৩১ মার্চ) ভোর ৪.৩০ মিনিটে রাজধানী ঢাকার মহাখালী শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন আল-হাইআতুল উলইয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত কো-চেয়ারম্যান, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ-বেফাকের ভারপ্রাপ্ত সিনিয়র সহ সভাপতি মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস। তিনি বেশ কিছুদিন ধরে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। জানাজার নামাজ তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া ইমদাদিয়া মনিরামপুর, যশোরে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ঢল নামে লাখো মানুষের। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৪বছর। তিনি ৩ ছেলে ও ৪ মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

বিস্তারিত পড়ুন

সম্পর্কিত পোস্ট

Back to top button
error: Content is protected !!