সিরাতুন নবি ﷺ

লেখক : ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি

বই : সিরাতুন নবি ﷺ
লেখক : ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি
বই আলোচক : মাহিরা ইশক

সীরাতে নববী হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার হিকমাহ্’র নিদর্শন এবং কুরআনে কারীমের জীবন্ত ব্যাখ্যা। রুগ্ন বিশ্বমানবতার তরে সীরাহ্ হচ্ছে এক মহা পথ্য।
সমস্যাসঙ্কুল অশান্ত পৃথিবীতে যিনি নিয়ে এসেছিলেন শান্তির বার্তা, বাতলে দিয়েছিলেন ব্যক্তি পর্যায় থেকে রাষ্ট্রপর্যায়ের সার্বিক মুক্তির পথ, যার মাধ্যমে আল্লাহ্‌ আমাদের দ্বীন কে করেছেন পরিপূর্ণ, যাঁকে ভালো না বাসলে পরিপূর্ণ হয়না ইমানের দাবী,সেই আল্লাহ্‌র রাসুলﷺ এর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়’ই লিপিবদ্ধ হয় সীরাতে।
সীরাত অধ্যয়নের সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গির সাথে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির বিস্তর ভিন্নতা রয়েছে। কারণ একজন মুসলমানের জন্য নবীজিরﷺ মুবারক সীরাত অধ্যয়ন শুধু জ্ঞানলাভের বিষয়ই নয়, বরং এটা আমাদের দ্বীনী প্রয়োজন। এই প্রয়োজন মিটানোর ধারাবাহিকতায়ই প্রকাশিত হয়েছে প্রশংসনীয় একটি প্রয়াস ‘সিরাতুন নবি’, যেটি প্রকাশের পর থেকেই লাভ করেছে উত্তরোত্তর পাঠকপ্রিয়তা।

প্রেক্ষাপট:
উম্মাহর প্রাথমিক যুগ থেকেই প্রজ্ঞাবান মুসলিমরা একেকজন একেক দৃষ্টিভঙ্গিতে রচনা করে আসছেন নবীজিরﷺ জীবনালেখ্য। যার ধারা আজও বহমান। সীরাহ্ রচনার এই নিনির্মিখ সাধনায় বিমুগ্ধ হয়েছেন অনেক অমুসলিমরাও। মারগোলিয়াথ-এর মত ইসলাম বিদ্বেষী প্রাচ্যবিদও বলতে বাধ্য হয়েছেন, ‘মুহাম্মদের জীবনীকারদের দীর্ঘ ফিরিস্তি রয়েছে। এটা গুণে শেষ করা অসম্ভব। তবে ফিরিস্তিতে নিজের স্থান করে নেয়া গৌরবের ব্যাপার’
এই গৌরবের ধারায় ড. আলি মুহাম্মদ সাল্লাবী নিঃসন্দেহে সমকালীন যুগের এক বিশ্বনন্দিত ব্যক্তিত্ব। তাকে পাঠকমহলে হাত ধরে পরিচয় করিয়ে দেওয়াটা নিতান্তই নিষ্প্রয়োজন। জগদ্বিখ্যাত ইতিহাসবিদ। কলম আর ইলমের জোরে তার খ্যাতি আজ বিশ্বজুড়ে।
তিনিই বিশুদ্ধ বর্ণনার আলোকে প্রাচীন সিরাতগ্রন্থের আলোচনা-পর্যালোচনা করে অবতারণা করেছেন অনবদ্য গবেষণাধর্মী সীরাহ্। অনন্য সেই সৃষ্টিকে ৩টি খন্ডে বাংলাভাষী পাঠকদের টেবিলে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে বহুল জনপ্রিয় মাকতাবা ‘কালান্তর প্রকাশনী ‘।

যাঁর জীবনগাঁথা:
একটিমাত্র মানুষ। যার হাত ধরে পাল্টে গেলো পৃথিবীর ইতিহাসের আদ্যোপান্ত। মোড় নিলো বিশ্বের সমাজব্যবস্থা। সভ্যতা বিনির্মানের তরীতে লাগলো নতুন এক হাওয়া। যাঁর প্রবর্তিত অর্থনৈতিক নীতিমালা অনুসরণে আজও মানবজাতিকে রাষ্ট্রের দাসত্ব ও পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার অভিশাপ থেকে দিতে পারে অবমুক্তি। সেই মানুষটাই আমাদের নবীজিﷺ। মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ। রাব্বের পরিকল্পনায় যিনি এসে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন গোটা পৃথিবী।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন বাকি পাঁচটে মানুষের মতো নিতান্তই সাধারণ। জন্ম,কর্ম,সংসার সর্বত্রই দায়িত্বপূর্ণ বিচরণে আসমানী-ধর্ম আর সংসার-ধর্মের সমন্বয়ে তিনি জগদ্বাসীর কাছে জীবন্ত উদাহারণ। কখনো খেঁটে খাওয়া মজুর, কখনো মেষপালক, কখনো ন্যায়বিচারক, কখনোবা রাষ্ট্রনায়ক হয়ে সমাজব্যবস্থার প্রতিটি অধ্যায়ে তিনি রেখে গেছেন অনুপ্রেরণার মরিচবাতি। জীবনের সমষ্টিস্বরূপ ‘উসওয়াতুন হাসানাহ’ হয়ে আছেন উম্মাহর মাঝে।
তাঁরই জীবনের প্রতিটা অধ্যায়, কর্ম ও শ্রম, দাওয়াহ ও ইবাদাহ, জিহাদ ও যুহদ, সংগ্রাম-সাধনা সবকিছুর বিস্তারিত জানার জন্য আপনাকে পাড়ি দিতে হবে ড. সাল্লাবীর সাথে; প্রায় ১৬০০ পেইজের সুদীর্ঘ যাত্রায়।

বইকথন:
বইটির মোট তিনটি খন্ড। গতানুগতিক ফরম্যাটের হলেও এই বইটি হচ্ছে তুলনামূলক তথ্যবহুল। নিঃসন্দেহে বইটি নবীপ্রেমিকদের তৃষ্ণা নিবারণ ও গবেষণাকর্মের জন্য যুগপৎভাবে সহায়ক। জন্মপূর্বকাল থেকে শুরু করে নবীজীবনের প্রতিটি অলিগলি ঘুরিয়ে নবীজির বেদনাবিধুর ইন্তেকাল পর্যন্ত সিকুয়েন্স আর রেফান্সের ভিত্তিতে সাজানো তিন খন্ডের এই সীরাতগ্রন্থটি।
-১ম খন্ড:
১ম খন্ডে আলোচিত হয়েছে নবীজির জন্মপূর্ব তৎকালীন আরবের অবস্থান ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলী, নবীজির জন্ম, বংশ, শৈশব, বেড়ে উঠা, ফিজার যুদ্ধ, হিলফুল ফুযূল, গোপনে ও প্রকাশ্যে দাওয়াত, প্রথম বিবাহ, প্রথম হিজরত, মিরাজ, আকাবার বাইয়াতসহ নববীজীবনের প্রাথমিক পর্যায়গুলো।
-২য় খন্ড:
২য় খন্ডের সূচনা হয় হিজরত দিয়ে। বিভিন্ন গোত্রের নিকট নুসরা ও হিজরত, আনসার ও মুহাজিরদের ভাতৃত্ব স্থাপন, মদিনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপসমূহ, মদিনা সনদ প্রণয়ন, মসজিদে নববী নির্মান সহ যুদ্ধপূর্বের সব আলোচনা হয়েছে এই খন্ডে। তবে যুদ্ধের বর্ণনাও রয়েছে। নবীজির জীবদ্দশার বৃহৎ যুদ্ধগুলো বদর, উহুদ, খন্দক সহ ছোটবড় আরো অনেক অভিযানের কথা উল্লেখ আছে এই খন্ডে।
-৩য় খন্ড:
সর্বশেষ খন্ডটিতে আলোচিত হয়েছে আহযাব যুদ্ধ, হুদায়বিয়ার সন্ধির রূপরেখা, দুটোর মধ্যবর্তী ঘটনাগুলোর সবিস্তর আলোচনা হয়েছে। এরপর আসে চূড়ান্ত বিজয় অর্থাৎ হুদায়বিয়ার সন্ধি, মক্কা বিজয়ের পটভূমি, মক্কাবিজয়ে নবীজির দূরদর্শী পরিকল্পনা ও শেষটায় ঝুলিতে ‘জয়’ নিয়ে ফেরা। বিজয়ের পর হুনাইন,তায়েফ,তাবুকযুদ্ধের বর্ণনাএ শিক্ষা নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং যবণিকায় পৌঁছেছে বিদায় হজ্জ ও নবীজির দুনিয়াত্যাগের মধ্য দিয়ে।

বইটির বিশেষত্ব:
গতানুগতিক বায়োগ্রাফির মতোই এই বইটিতে সবিস্তারে আলোচিত হয়েছে নববীজীবন। তবে এর মূল আকর্ষণ হচ্ছে তথ্য ও তত্ত্বের সমন্বয়। বিভিন্ন সীরাহগ্রন্থের গবেষণার ফসল। ভিন্ন ভিন্ন সীরাতের ফ্লেভার নেওয়া যায়।
বিভিন্ন ঘটনাবলী বর্ণনার সিকুয়েন্স ও রেফারেন্স দুটোই মেইনটেইন করা হয়েছে। এতে পড়ার মধ্যে অবিন্যস্ততা আসার যেমন চান্স নাই, তেমন অথেনসিটি নিয়েও আলাদা মাথাব্যথা নাই।
সীরাহর জন্য ব্যাপকভাবে গবেষণাধর্মী কাজ ও ঘাটাঘাটির জন্য অত্যন্ত সহায়ক এই বই। বিন্যাস কিংবা উপস্থাপন সবদিক দিয়ে ব্যতিক্রমধর্মী। বাংলাভাষী গবেষকদের জন্য সম্ভবত বেস্ট অপশন।
তাছাড়া শুধুমাত্র কাঠখোট্টা আলোচনায় একঘেয়ে বর্ণনাতেই লেখক সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং তুলে ধরেছেন ঘটনা থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাকে; পাঠককে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন উপলব্ধির কাঠগড়ায়।
এ’তো গেলো অভ্যন্তরীণ বিশেষত্ব! বাহ্যিকভাবে বইয়ের বাইন্ডিং কিংবা পেইজ কোয়ালিটি সবদিক দিয়েই উন্নতমানের। অনুবাদকদের পোক্তহাত তাতে বাড়িয়ে দিয়েছে আরো দু’চামচ বিশেষণের যোগমাত্রা। ঝরঝরে এবং সুখপাঠ্য। সবমিলিয়ে, বইটি পাঠকদের জন্য একটা চমৎকার সীরাহগ্রন্থ।

নিজস্ব অভিমত:
মানবজীবনের সর্বক্ষেত্রে গৌরবময় উত্তরণের জন্য একটা আইডল থাকে; থাকে অনুসরণীয় আদর্শ। আদর্শহীন কোনো জনগোষ্ঠী সুবিন্যস্তভাবে সফলতা লাভ করতে পারেনা। তাই, আজকের এই নব্য জাহিলিয়াতের যুগেও যদি মুসলিম উম্মাহ ফিরে পেতে চায় তাদের সোনালী অতীত, বর্ণালী ইতিহাস। তাহলে অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে প্রিয়নবী (সা.)-এর সীরাত। সুতরাং সেই পথেই হোক আমাদের নব যাত্রা। আদর্শিক প্রত্যয়ে প্রাণবন্ত হয়ে উঠুক গোটা মানবজীবন।
আর এর জন্য আলোচ্য বইটি হচ্ছে একটা কম্বো। গবেষণাধর্মী ও তথ্যবহুল আলোচনায় মূল শিক্ষাটা প্রদান করা চাট্টিখানি কথা নয় কিন্তু! কলেবরের কিংবা খন্ডে বড় হোক, পড়তে পড়তে হারিয়ে যাওয়া যাবে নববীজীবনের প্রত্যেকটা স্তরে। ইনশাআল্লাহ্।

বই বৃত্তান্ত:
বই : সিরাতুন নবিﷺ
লেখক : ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি
অনুবাদক : আব্দুর রশীদ তারাপাশী, মহিউদ্দিন কাসেমী, নুরুযযামান নাহিদ
প্রকাশনী : কালান্তর প্রকাশনী
প্রচ্ছদমূল্য : প্রতি খণ্ড ৳৬০০

বিস্তারিত পড়ুন
Back to top button
error: Content is protected !!